শখের লাইফস্টাইল ও ঋণের ফাঁদ: ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা
সামর্থ্যের ঊর্ধ্বে ঋণ করে জীবনযাপন করা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক গভীর ঝুঁকির জন্ম দেয়, যা একাধিক স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই লেখায় চারটি প্রধান স্তরের আলোচনা করা হয়েছে।

ক্যাশবিহীন অর্থনীতির যুগে মানুষের মানিব্যাগে নগদ অর্থের পরিবর্তে প্লাস্টিকের কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। 'বাই নাও, পে লেটার' বা সুদবিহীন ইএমআই-এর মাধ্যমে সর্বশেষ মডেলের ফোন কেনা, দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়া অথবা ধার করে বিদেশ ভ্রমণকে এক প্রকার 'প্রগতিশীল লাইফস্টাইল' হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ঋণের জীবন যাপন করা কেবল একটি একক সমস্যা নয়, বরং এটি একাধিক ঝুঁকির সৃষ্টি করে যার প্রতিটি স্তর পূর্ববর্তী স্তরের চেয়ে গুরুতর।
প্রথমত, ঋণের কারণে ব্যক্তির চরিত্রে মিথ্যা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। মহানবী (সা.) ঋণ থেকে আশ্রয় চেয়ে দোয়া করতেন এবং স্পষ্ট বলেছেন যে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা ভঙ্গ করে। কিস্তি পরিশোধের তারিখ ঘনিয়ে এলে অজুহাত তৈরি করা বা পরিবারের কাছে ব্যয় গোপন করার মতো ছোট ছোট অভ্যাস মানুষের চরিত্রে মিথ্যার প্রবর্তন ঘটায়। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ঋণের একটি বড় অংশ সুদের ওপর নির্ভরশীল। 'বিনা সুদে ইএমআই'-এর মতো লোভনীয় প্রস্তাবগুলোও কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব হলে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ আরোপ করে, যা কোরআনে বর্ণিত সুদের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। কোরআনে সুদকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণার সমতুল্য বলা হয়েছে, যা মুমিনদের জন্য অত্যন্ত গুরুতর একটি পাপ।
তৃতীয়ত, ঋণের মাধ্যমে কেনাকাটায় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থাকে, যেখানে হাতে থেকে যাওয়া নগদ অর্থের কষ্ট অনুভূত হয় না। এর ফলে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র নির্দ্বিধায় কিনে ফেলে, যা অপচয়ের শামিল। কোরআন অনুসারীদের ব্যয় করার ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে অপচয় বা কার্পণ্য কোনটিরই স্থান নেই। 'শখের লাইফস্টাইল' অনুসরণ করতে গিয়ে এই মানদণ্ড বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রতিটি পয়সার হিসাব কিয়ামতের দিনে দিতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিনে বান্দাকে তার ধনসম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোন খাতে ব্যয় করেছে, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
সর্বোপরি, ঋণের সবচেয়ে গুরুতর স্তরটি আসে মৃত্যুর পর, যখন সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকে না। রাসূল (সা.) বলেছেন, মুমিনের আত্মা তার ঋণের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়। এই ঋণের বোঝা এতটাই গুরুতর যে এমনকি শাহাদাতের মর্যাদা লাভকারী ব্যক্তিও ঋণের দায় থেকে মুক্তি পান না। সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেও যদি ঋণের দায়মুক্তি না হয়, তবে নিছক লাইফস্টাইল আপগ্রেডের জন্য নেওয়া ঋণ কতটা হালকাভাবে দেখা উচিত, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন। এই চারটি স্তর একসাথে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, কার্ডের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে শখ পূরণ করা কেবল একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়; এটি একাধারে মিথ্যাচার, সুদের ভয়াবহতা, অপচয়ের জবাবদিহিতা এবং মৃত্যুর পরেও মুক্তিহীন আত্মিক বন্ধনের মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
তথ্য যাচাই
ঘটনাপ্রবাহ
মন্তব্য
- আআরিফ হাসান
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, দ্রুত বাস্তবায়ন কামনা করি।
- ননাফিসা তাবাসসুম
প্রতিবেদনটি খুবই তথ্যবহুল হয়েছে।
- সসজীব রায়
বেসরকারি খাতেও সমন্বয় জরুরি।